নতুন কবির পাণ্ডুলিপি

গত সপ্তায় একটা ফোন পেয়েছিলাম। ভদ্রমহিলা আমাদের কবিতা পাঠিয়েছেন মাস দুই আগে। কিন্তু আমরা মোটেও জানাইনি তাঁর লেখাগুলো নির্বাচিত হয়েছে কিনা। আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম এবং আমার ঘুমের বহর যারা জানে, তারা জানে। বললাম, “ঠিক আছে, কোন মেল আইডি থেকে কবিতা পাঠিয়েছিলেন কাইন্ডলি সেটা এস এম এস করুন।” পাশ ফিরে শুলাম। আবার ফোনের ওপর ফোন। আমি মেসেজ করে দিলাম, “পরে কথা বলব।” তখনই দেখলাম এস এম এস-এ মেল আইডি-টা এসেছে। পরদিন মেলবক্স খুঁজে দেখলাম। কিন্তু না, সেই মেল আইডি থেকে কোনও মেল নেই। না আমার নিজের মেলবক্সে, না সৃষ্টিসুখের। এমনকী টগবগেও একবার খুঁজে এলাম। নেই।
পরে আরও দু দিন তিনি কল করলেন। আমি ধরতে পারিনি। ঠিক করলাম, সময় মতো আমিই ফোন করে জানাব যে, মেল খুঁজে পাইনি। তারপর আবার নানা কাজের চাপে ভুলে গেছি।

পরশু হঠাৎ ফোন তাঁর। ওদিকে মিশর থেকে ক্লায়েন্ট একতাড়া অভিযোগ নিয়ে বসেছে। তাদের একটা করে পয়েন্ট শেষ হচ্ছে, ওদিক থেকে সেই কবিতালিখিয়ে একবার করে ফোন করছেন। আর আমি কাটছি। এমন করে ঘণ্টাখানেক কাটল। মিটিং শেষে ঘুরিয়ে ফোন করে বললাম, “আমি কিন্তু আপনার কোনও মেল পাইনি।” তা উনি বললেন, “না, সেটা অসম্ভব। আমি মাস দুয়েক আগে পাঠিয়েছি।” সামান্য সন্দেহ হল, জিজ্ঞাসা করলাম, “কোন মেল আইডি-তে পাঠিয়েছেন?” উত্তর এল, “ডাবলু ডাবলু ডাবলু ডট সৃষ্টিসুখ ডট কম।”
– ওটা আমাদের ওয়েবসাইটের এ্যাড্রেস। মেল আই ডি নয়।
– কিন্তু আপনি তো এটাতেই পাঠাতে বলেছিলেন।
বৃথা তর্কে সময় নষ্ট। তাই বললাম, “একটা মেল আই ডি টেক্সট করছি… ইয়ে, এস এম এস করছি। ওটাতে পাঠান।”

গতকাল ঘুমাচ্ছি। আবার ফোনের ওপর ফোন। বুঝলাম, মেল এসে গেছে। খুললাম। ডায়রির পাতায় হাতে লিখে স্ক্যান করে পাঠানো। হাতের লেখা পরিষ্কার। বানান একটাও ভুল নেই প্রায়। তবে লেখার হাতটা বড়ই কাঁচা। সবে লিখছেন মনে হল। দু-একটা কবিতা পড়ে আর পড়ার ইচ্ছে হল না বিশেষ। পাতা ওলটাচ্ছি, হঠাৎ একটা পাতায় দেখি লেখা আছে।
শব্দার্থঃ
আকস্মিক — সহসা
অঞ্জন — কাজল
থাল – থালা
চুনুরি — রঙিন কাপড়
তাঁর পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহৃত কঠিন কঠিন শব্দের অর্থ দিয়ে একটা লম্বা তালিকা। প্রকাশক বা সম্পাদকের প্রতি তাঁর এই সহমর্মিতাতে সত্যিই মজা পেলাম। আরও দু-একটা পাতা পরে দেখলাম সাধু ভাষায় লেখা একটা গল্প আছে। এবং আমার অনুমানটা সত্যি। ভদ্রমহিলা একজন স্কুল-ছাত্রী। পড়েন আল আমীন মিশনের ধুলিয়ান শাখায়। গল্পের নীচে এক জায়গায় তাঁর স্বাক্ষর এবং ঠিকানা লেখা আছে সেই মর্মে।
একটু সতর্ক হলাম। এ বয়সটা বড় অভিমানী। বড় সর্বনেশে। অনেক ভেবে লিখলাম, “আপনার মেল পেয়েছি এবং লেখাগুলো দেখেছি। আপাতত এই পাণ্ডুলিপি থেকে বই করা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনার লেখা সম্ভাবনাময়, ভবিষ্যতে আশা করি তা আরও সমৃদ্ধ হবে।”
হয়তো এ ভদ্রমহিলা দু-এক বছর পরে আর লিখবেন না। দুনিয়াদারির জোয়াল কাঁধে আরও চেপে বসলে এই চর্চা ইঁট চাপা ঘাসের মতো বিবর্ণ হয়ে যাবে। তাতে বাংলা সাহিত্যের কিছুমাত্র ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। বা হয়তো আরও লিখবেন। খুব ভালো এবং পরিণত গল্প-কবিতাই লিখবেন। এবং লেখা প্রকাশের জন্যে আমাদের মতো ছোট প্রকাশনার ওপর তাঁকে নির্ভর করতে হবে না। অথবা, কে জানে, হয়তো এমনই লিখতে থাকবেন তখনও।
কিন্তু তারপরও তিনি যদি সে সমস্ত লেখা পাঠান, নিঃসন্দেহে খুশি হব। যতই হোক, তিনি আমার স্কুলের ছাত্রী। এবং প্রথমবার পাণ্ডুলিপি পাঠানোর সময় দয়াপরবশ হয়ে তিনি ব্যবহৃত শব্দের অর্থও লিখে জানিয়েছিলেন আমায়, এটা তো ভোলার নয়। এমন করে দরদ দিয়ে কজন পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে থাকেন?

7

No Comments Yet.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *