যাত্রী

আজ হোটেলে একটু তাড়াতাড়িই ফিরেছি অফিস থেকে। হঠাৎ দেখি বাইরে থেকে কেউ দরজা খোলার চেষ্টা করছে। যে ঢুকল, সে রুম সার্ভিসের ছেলে। ঢুকেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল আমায় দেখে। বোঝাই যাচ্ছে, আশা করেনি আমি ঘরের মধ্যে থাকব, নাহলে কলিং বেল বাজিয়ে আসত। ঘরের মধ্যে এসে আমায় অবাক করে সে একটা বই বাড়িয়ে ধরল। দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যর যাত্রী উপন্যাসের প্রথম খণ্ড। বইটা আমার বিছানার পাশের ছোট টেবলটাতে থাকে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে রোজই পড়ি প্রায়। সত্যি বলতে কী, যে কোনও বিদেশ ভ্রমণেই কোনও না কোনও বই সঙ্গে থাকে। ছোট বই হলে দু-তিনটে। এই যাত্রায় ছিল শুধু যাত্রী।
তার হাত থেকে বইটা নিতে ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো গলায় বলল, “সরি স্যর, না বলে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঘর পরিষ্কার করতে করতে চোখে পড়েছিল। এক-দু’পাতা উলটে ভালো লেগেছিল, তাই পড়তে নিয়ে গিয়েছিলাম।” সত্যি বলতে কী, যারা বই পড়ে তারা সবাই আমার আপনজন। আমি ছেলেটির পিঠ চাপড়ে দিলাম, “আরে ঠিক আছে। তা একদিনে এতবড় বই পড়া হয়ে গেল? নিয়ে যাও, শেষ করে ফেরত দিয়ে যেও।”
এবার সে যা শোনাল, তা চমকপ্রদ। আমি এই হোটেলে আসার পরদিনই সে সকালে ঘর পরিষ্কার করতে এসে বইটা ‘ধার’ নিয়ে যায় আমার ঘর থেকে। আর রোজ বিকালে ফেরত দিয়ে যায়। দুপুরে লাঞ্চ সেরে রোজ এক-দেড়ঘণ্টা নিয়ম করে সে বইটা পড়ত। আগে আমি ছিলাম ছ’তলায়। মাঝে সেই ঘরের এসি গন্ডগোল করায় আমার ঘর বদল হয় তিনতলায়। এই পাঠক কিন্তু আমার পিছু ছাড়েনি। প্রথমে সে ভেবেছিল আমি হোটেল ছেড়ে চলে গেছি। কিন্তু দু’দিন পরে ডাইনিং এরিয়ায় ব্রেকফাস্ট করার সময় সে আমায় আবিষ্কার করে। তখন কায়দা করে যাচাই করার অছিলায় সে আমার রুম নাম্বার জেনে নেয়। আমিও সরল বিশ্বাসে বলে দিয়েছিলাম। কারণ, ব্রেকফাস্টের সময় সত্যি করেই এরা অ্যাটেনডেন্স নেওয়ার মতো করে খাতা ধরে রুম নাম্বার লিখে নেয়। যাই হোক, এরপর ম্যানেজমেন্টকে ধরে করে নিজের ডিউটি বদল করে নেয় সে আমার ফ্লোরে। তারপর আবার পড়া শুরু হয়। আজ সে জানত না আমি এত তাড়াতাড়ি ফিরব, তাই বমাল ধরা পড়ে গেছে।
একনাগাড়ে পুরোটা বলে সে অনুরোধ করল, “স্যর, প্লিজ কমপ্লেন করবেন না। আমি এমনি এমনি বই পড়িনি। বদলে আপনার রুমে রোজ তিন বোতল করে পানি রেখে গেছি।” অ্যাদ্দিনে অতিরিক্ত জলের বোতল পাওয়ার কারণ জানা গেল। কমপ্লিমেন্টারি একটা বোতলই প্রাপ্য। বাকিটা অন্যান্যবার বাইরে থেকে কিনতে হত। ভেবেছিলাম, আমায় নিয়মিত কাস্টমার দেখে এরা এবার বাড়তি খাতির করছে। কিন্তু এর পেছনে যে এই পড়ুয়া রুমবয় ছিল, কে আন্দাজ করেছিল!
ট্যাগ থেকে দেখলাম, তার নাম ফিরদৌস। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, বাড়ি কক্সবাজার। আমি তাকে চেয়ারে বসতে দিয়ে বললাম, “ফিরদৌস ভাই, এই বই তুমিই নিয়ে যাও। আমার কাছে আরও কপি আছে।” সে লাজুক গলায় বলল, “এটা তো আমার পড়া হয়ে গেছে স্যর। আপনার কাছে এই বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড থাকলে দিন।” এখন নেই, তবে শীঘ্রই আমি ফেরত আসব। তাই বললাম, “আমি সামনের বার পরের খণ্ডটা আনব। কিন্তু তব তক কে লিয়ে পানির বোতলের সরবরাহ যেন ঠিক থাকে।”
ফিরদৌস আমার প্রকাশক-জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা উপহার দিয়ে একগাল হেসে বিদায় নিল।

3

No Comments Yet.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *