আমার নাম রোহণ কুদ্দুস

বাস রাস্তা পেরিয়ে মোরামে বেছানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম মিশনের দোরগোড়ায়। কলাপাতা রঙের দোতলা বাড়িটার সামনে সবুজ মাঠ। একটা-দুটো-তিনটে – এইখানে মিশনের ছেলেরা খেলে বুঝি? আজ অবশ্য খেলার উপায় নেই। মাঠ ভর্তি গাড়ি। নানা রঙের, নানা আকারের। আর বিস্তর লোকজন। যাকে বলে ‘হৈ-হৈ কান্ড, রৈ-রৈ ব্যাপার, গোবিন্দলাল অন হর্সব্যাক’ (সেই সময় আনন্দমেলায় পূজাবার্ষিকীর একটা গল্প থেকে এই লাইনটা পাওয়া)। বাতাসে রান্নার গন্ধ আসছে একেবারে বিয়েবাড়ির মতো। অমন গন্ধে রীতিমতো খিদে পেয়ে গেল। দেরি হওয়ার ভয়-ভীতি ভুল কাকা-ভাইপোতে কুপন কিনে বসে পড়লাম খেতে। কার কাছ থেকে ফুলকাকু এর মধ্যেই খবর নিয়েছে এখানে পরীক্ষায় দেরি করে আসাটা তেমন গুরুতর অপরাধ নয়। আমরা এখনও পশ্চিমবাংলার চৌহদ্দিতেই আছি, অতএব কোনও চিন্তা নেই। খেয়েদেয়ে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিতে যাও। আর একজন অভিভাবকের মুখে শুনলাম, একসাথে দশজন ছেলেকে একসাথে ঘরে ঢুকিয়ে প্রশ্ন করছেন একদল ইন্টারভিউয়ার। শুনে একটু একটু ভয় করছিল। কিন্তু সামনে খাবার দেখে ভয় আবার পিঠটান দিল।

অনেক লোকজন এসেছেন। ছাত্র, তাদের অভিভাবক। তাই মিশনের নিয়মিত খাওয়ার ঘরের সাথে সাথেই একতলার আরও দু-তিনটে ক্লাসরুমে বেঞ্চ সাজিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শালপাতার প্লেট নিয়ে আমরাও বসে গেলাম এমনই একটা ঘরে। মাছের ব্যবস্থা ছিল। আর মাছ না খেলে ডিম। বাড়িতে মাছ না ছাড়িয়ে দিলে আমি খাই না। এখনও। ভাগ্য ভালো সেদিন সবার সামনে ফুলকাকু আর সেই ঝুঁকি নিল না। আমি তেলে ভাজা লাল-হলুদ সেদ্ধ ডিম আর ডুমো করে কাটা আলুর দমের সাথে গোগ্রাসে ভাত গিলতে লাগলাম। সাথে ছিল আম দেওয়া টক ডাল। তবে যে সিনেমা বা গল্প পড়া যায় হোস্টেলের খাবার বাজে? ফুলকাকু যতই বলুক ‘মোটামুটি’, আমার তো এই খাবার দিব্যি লাগছে। মাঝে একজন এসে খোঁজ নিয়ে গেল আর কিছু লাগবে কিনা। আমি ভদ্রতার ধার না ধেরেই আরও কিছুটা টক ডাল নিলাম।

 

খেয়েদেয়ে হাত ধুয়ে মুখ মুছে ফুলকাকু হঠাৎ করে আবিষ্কার করল আমাদের পাশের গ্রামের এক ভদ্রলোককে। রউফ সাহেব। ভদ্রলোক বাপির নাম শুনেই আমায় ‘দাদু’ বলে জড়িয়ে ধরলেন। চিনি না, জানি না এমন একজন বয়স্ক মানুষ আমায় দাদু বলে ডাকছেন – ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ রহস্যজনক ঠেকল। জানা গেল, উনি ওনার ছেলে আর ভাইপোকে নিয়ে এসেছেন ইন্টারভিউয়ের জন্যে। সবচাইতে ভালো ব্যাপার ওনারা একটা গাড়িও এনেছেন। হাত তুলে মাঠের দিকে দেখালেন। একটা অটোরিক্সা দাঁড়িয়ে আছে। বাগনান থেকে যে এতদূরে অটোরিক্সাতেও আসা যায়, তা আমার কল্পনার অতীত ছিল। বলে রাখা ভালো, এটা দেখেই বাগনান থেকে বোম্বে রোড ধরে অটো চড়ে বোম্বে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা পরে আমি করেছিলাম। কিন্তু সে গল্প এখানে নয়। আমাদের খাওয়া দাওয়া, মাই ঢেঁকুর তোলা পর্যন্ত তুমি দেখে নিয়েছ। এবার চলো পরীক্ষা মানে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া যাক।

 

দোতলার একটা ঘরে ক্লাস ফাইভের ইন্টারভিউ হচ্ছিল। ঘরটার দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। ভেতরে কী হচ্ছে খোদায় মালুম। দরজার বাইরে একটা লিস্ট হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক (পরে জেনেছিলাম সে ক্লাস নাইনে পড়ে, নাম সাহিদ)। তার কাছে গিয়ে আমার নাম আর রোল নম্বর বলতে হল। এইসব পদ্ধতি রউফদাদু শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আরও কয়েকজন ছাত্র দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সাথে। মিনিট পনেরো পর আমাদের ডাক পড়ল। একসাথে দশজন। ফুলকাকু এই প্রথম পরীক্ষা নিয়ে মুখ খুলল – “যা জিজ্ঞাসা করবে মাথা ঠান্ডা করে উত্তর দিবি। বেশি হড়বড় করার দরকার নেই।” আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে ঢুকে পড়লাম ঘরের ভেতর। ঘরের মধ্যে আলো অল্প। সম্ভবত রোদের তাপ আটাকানোর জন্যে জানালার পাল্লা ভেজিয়ে রাখা। জানালার আধখানা খুলে রাখা পাল্লা থেকে যতটা আলো ঢোকে সেই আলোতে চোখ সয়ে আসার পর দেখলাম একটা লম্বা টেবিলের একদিকে বেঞ্চে বসে আমরা দশজন পরীক্ষার্থী। আর ওপাশে জনা পাঁচেক পরীক্ষক। ওপরে একটা ফ্যান ঘুরছে। তা থেকে গরম হাওয়া নামছে।

হাতে কাগজ কলম ধরিয়ে দেওয়া হল আমাদের। কাগজের ওপর নাম আর রোল নাম্বার লিখে ফেললাম টুকটুক করে। এমন সময় একজন গম্ভীর মানুষ একটা ছবি তুলে ধরলেন – “এই ছবিতে কী দেখতে পাচ্ছ লেখো। এক মিনিট সময়।” পুকুরপাড়ে বসে একটা লোক মাছ ধরছে। সংলগ্ন মেঠো পথ ধরে একজন লোক সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। মাঠে দু-তিনজন কৃষক কাজ করছে। সব মিলিয়ে একটা গ্রামের দৃশ্য। এক মিনিটে যা লেখা যায় লিখলাম। তারপর জিজ্ঞাসা করা হল – “বিদ্যুৎশক্তি আমাদের কী কী ভাবে উপকার করে।” ৫-৬ জন হাত তুললো। তার মধ্যে বলার সুযোগ পেল আমার সময়ে মিশনের সবচেয়ে পুচকে ছেলে সাব্বির আলি আশা। আশা বেশ গুছিয়েই বলল ফ্যান ঘোরা, লাইট জ্বলার ব্যাপার-স্যাপার। পরের প্রশ্ন – “অপ্রচলিত শক্তির উৎস বলতে কী বোঝ?” কেউ একজন বলল – “যে শক্তি অপ্রচলিত।” ঘাড় নাড়তে নাড়তে প্রশ্নকর্তা আবার প্রশ্ন করলেন – “উদাহরণ দিতে পারবে?”

পারব বইকি। আমি এতক্ষণে নড়েচড়ে বসলাম। তখন দূরদর্শনে প্রায়ই দেখানো হত সৌরশক্তির ব্যবহার, সোলার সেলের গঠন, সোলার প্যানেল এবং সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের উপকারিতা। আমি রীতিমতো একটা ছোট বক্তৃতা দিয়ে ফেললাম। টিভিতে যা দেখতাম, হুবহু তাই বলে গেলাম। সোলার সেলের ছবি এঁকে দেখালাম একটা ব্ল্যাকবোর্ডে। কিচ্ছু বাদ দিইনি। এমনকী এক ইউনিট বিদ্যুত তৈরির খরচ পর্যন্ত বলে দিয়েছি। আমার কথা শেষ হতেই ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে আরম্ভ করলেন। তাঁর দেখাদেখি আর সবাই। পরে জেনেছিলাম, সেই পরীক্ষকের নাম রফিক মিদ্দা – একজন বিজ্ঞানী। তিনি সোলার প্যানেল এবং ঐসব কিছুর ওপর গবেষণা করছেন প্যারিসে। ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন, তাই সেক্রেটারি স্যার ধরে এনেছেন মিশনের ইন্টারভিউতে। তাঁরই গ্রামের ছেলে কিনা।

 

আমার পরীক্ষা তো শেষ। রউফদাদুর জিম্মায় রেখে ফুলকাকু চলে গেল কলকাতায়। বড়মণি নার্সিংহোমে ভর্তি আছে। সেখানেও যাওয়া দরকার। ঠিক হল রউফ দাদু আমায় সঙ্গে নিয়ে বাগনানে ফিরবেন। ওনার ছেলে মমতাজুল আর ভাইপো সফিকুরদার সাথেও আলাপ হল। ওদের ইন্টারভিউ তখনও হয়নি। একটা বড় হলঘরের মধ্যে চেয়ারে বসে আছি। অনেক ছাত্র-অভিভাবক বসে আছেন এদিক ওদিকে। এভাবে বসে থাকতে থাকতে ঢুলুনিও আসছে মাঝে মাঝে। তাই উঠে গিয়ে লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়ালাম। এল শেপের বারান্দার অন্যদিকের ঘরগুলোতে মিশনের ছাত্ররা থাকে।

এদিক ওদিক ঘুরে তাদের ঘর থেকে একটা গল্পের বই চেয়ে এনে পড়তে লাগলাম হলঘরে বসে। ক্লাস এইটের দ্রুতপঠন বই। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের অংশবিশেষ থেকে শুরু করে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের রুমাল। সব আছে সেই বইয়ে। চেয়ার বসে বসেই বইটা শেষ হয়ে গেল একসময়। সন্ধ্যেও নেমেছে। তখনও রউফদাদুরা অপেক্ষা করছেন কখন ডাক আসে। পরে বুঝেছিলাম ইন্টারভিউ আসলে হয়ে গিয়েছিল। কথা বাকি আছে ডোনেশানের ব্যাপার নিয়ে। আর সেটা হবে সেক্রেটারি স্যারের সাথে। ভর্তি পরীক্ষার দিন নানা কাজে তিনি ব্যস্ত। তাই এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

এইটের দাদাদের থেকে চেয়ে আনা বইটা ফেরত দিতে গেলাম আবার। তখন ২-১ জন আমার জিজ্ঞাসা করে আবিষ্কার করল – এই সেই ছেলে, যে কিনা সোলার সেল জানে। কীভাবে যেন আমার অজান্তেই আমার নাম অনেকে জেনে গেছে তখন। আমায় বেশ কিছু ছাত্র ঘিরে ধরে এটা-ওটা প্রশ্ন করছে, হঠাৎ শুনতে পেলাম আমার রোল নাম্বার লাউড স্পিকারে ঘোষণা করা হচ্ছে। অবিলম্বে সেক্রেটারি স্যারের অফিসে যেতে বলা হচ্ছে। অফিসটা কোথায়? দাদাদেরই একজন পৌঁছে দিল আমায়। দোতলা আর ছাদের সিঁড়ির মাঝে আড়াই তলায় সাজানো-গোছানো ছিমছাম একটা ছোট অফিস ঘর। এখানে বসেই আল আমীন মিশনের সাধারণ সম্পাদক রাজ্যপাট সামলান।

 

সেই মুহূর্তটা আমার জীবনের এ্যালবামে চিরদিনের জন্যে তোলা রইল, যাকে আমরা পাকামি করে বলি ‘কোডাক মোমেন্ট’। একজন ফর্সা, কোঁকড়ানো চুলের মানুষ আমায় হেসে জিজ্ঞাসা করছেন – “তুমি থাকবে তো আমাদের মিশনে? ভালো লেগেছে মিশন?” থাকব না মানে? সে জন্যেই তো পরীক্ষা দিতে আসা। আর ভালো লাগবে না? এমন বিয়েবাড়ির মতো লাইন দিয়ে বসে খাওয়া-দাওয়া! এমন হৈ-চৈ! তার থেকেও বড় ব্যাপার জনে জনে ডেকে আমায় এখন জিজ্ঞাসা করছে – “তোমার নাম কি রোহণ কুদ্দুস?”একবেলাতেই বুঝে গেছি এটা আমার জায়গা। থাকব তো বটেই। হতে পারে আমি এখনও নিজের হাতে জুতোর ফিতে বাঁধতে পারি না। বা স্কুলে যাওয়ার সময় তাড়া থাকলে আমায় ভাত খাইয়ে দিতে হয়। জামাকাপড় ধুতে পারা তো দূরের কথা সেগুলোকে আলনাতে গুছিয়ে রাখতেও পারি না। আর এই জন্যে আমার হোস্টেলে থাকার কথা শুনলে ছোটমণি থেকে ছোটদি সবাই হেসে ফেলে। কিন্তু তবু আমি মিশনে তো থাকবই। অনেক কিছুই পারি না। শিখে নেব।

জানা গেল লিখিত আর মৌখিক পরীক্ষার মিলিত ফলাফলে ক্লাস ফাইভের অ্যাডমিশান টেস্টে আমিই প্রথম হয়েছি। তাই সেক্রেটারি স্যার আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা করছেন – “অন্য কোনও স্কুলে চলে যাবে না তো? কবে আসছ এখানে?”

10
2 Comments
  • ইমরান তাহের
    October 17, 2016

    খুব সহজ ভাষায় এত রসসিক্ত করে একমাত্র তুমিই লিখতে পারো রোহণ দা।পড়ে মন প্রাণ ভরে গেল।

    • rohonkuddus@gmail.com
      November 1, 2016

      Thanks you 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *