স্বদেশ সেন স্মরণে

তার পকেটে তখন একশ টাকা। অটোরিক্সা খুচরোর জন্যে দাঁত খিঁচিয়ে চলেছে; সাত টাকার জন্যে বড় নোটের খুচরো দিতে পারবে না। ফুটপাতের জীর্ণ ভদ্রলোকের দিকে সে ঝুঁকল – “কাকু খুচরো দেবেন?” ঘোলাটে চশমার পেছনে একজোড়া ঝকঝকে চোখ আর সামনে বিছিয়ে রাখা এক রাশ বই দেখে যোগ করল – “প্লিজ?” ভদ্রলোক মৃদু স্বরে বললেন – “একটা বই কেনো। সব পনেরো টাকা।” পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বই বেচছেন বুঝেও সে নিরুপায়। দশে রফা হল। অটোওয়ালার হাতে একটা দশ গুঁজে দিয়ে সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বইগুলোর সামনে। একটা বেছে নিতে হবে। এ যেন সেই অসংখ্য পানপাত্রের মধ্যে ঈশ্বরের অনন্ত যৌবনের পেয়ালাটা হাতে তুলে নেওয়ার ধাঁধাঁ। মিনিট দশেক পরে সে একটা হলদেটে কবিতার বই নিয়ে ঢুকল সামনের কোচিং সেন্টারে।

পরের একটা মাস সে সেই কবিতার বইটাই পড়তে থাকল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। আর সব টিন-এজ বালকের মতই তার কাছে কবিতা ছিল অভিমান, প্রেম, বৈরাগ্য। কবিতা তার কাছে ছিল ঝাউপাতা, খাতার ভেতর চেপ্টে রাখা সুগন্ধী পাপড়ি। এই বইয়েও কবিতা তাই-ই। কিন্তু তার চেনা গণ্ডির বাইরে বসে পঙক্তিগুলো লেখা হয়েছে। তাই তার আকর্ষণ অমোঘ। ছেলেটা একসময় অঙ্কের খাতার আড়ালে লিখতে আরম্ভ করল কবিতা। তার মাস্টারমশাইরা উদ্বিগ্ন হলেন। বাবা-মা বকুনি দিলেন, বোঝালেন। শত চেষ্টাতেও কবিতা রোগ সারল না।

এখনও মনে মনে সে এবড়ো-খেবড়ো কোণামোড়া পোকায় ফুটো করা প্রচ্ছদে হাত বোলায়। এক যুগ আগে পড়ন্ত সেই বিকেলে সে সঠিক পানপাত্রটিই বেছে নিয়েছিল। সম্প্রতি সেই বইয়ের কবি অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন। যুবকের কাছে থেকে গেছে মাটিতে দুধের কাপ।

0

No Comments Yet.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *