লোলহাস্য

কদিন আগে এক ফেসবুক বন্ধু (সম্ভবত পরিচয় পাত্র) লিখেছিলেন LOL শব্দটি আর ব্যবহার করা যাবে না বলে কেউ কেউ দাবি তুলেছেন। যাঁরা আপত্তি করেছেন, তাঁদের মতে LOL মানে নাকি Lucifer Our Lord, অতএব এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করার অর্থই হল শয়তানের ভজনা ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ধর্মের আফিমে যাঁরা বুঁদ, তাঁরা সাপকে রজ্জুভ্রমও করেন, তাঁদের তুরীয় অবস্থা নিয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু আমার মতো অল্পশিক্ষিত লোকজনদের কীর্তিকলাপ করা নিয়ে একটু হাসিঠাট্টা করাই যায়।
আমি জানতাম LOL মানে Lots of Love, ঐ অর্থে ব্যবহারও করেছি কখনও কখনও। তা মাসকয় আগে একদিন আমার এক অফিসতুতো ছানা মেসেজ করল – “My uncle passed away last night. I will not be available at office today.” আমি সমবেদনা জানিয়ে দু-এক কথা লিখে শেষে উল্লেখ করতে ভুললাম না – LOL। এই চরম দুঃসংবাদের দিনে কাউকে ভালোবাসা দেওয়াটা ম্যানেজারে দায়িত্ব ও কর্তব্য। তা আমার মেসেজের উত্তরে লিখল – “তোমার জীবনে এত হাসি কেন? মজার কী ঘটল এখানে?” হাসি! এক মুহূর্ত চিন্তা করলাম। ভালোবাসাই তো জানিয়েছি। তাও ১১০% প্লেটোনিক ভালোবাসা। যদিও সেই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকতেই পারে। কিন্তু হাসি?
সঙ্গে সঙ্গে গুগল করে বুঝলাম কী মাত্রায় ছড়িয়েছি। রিখটার স্কেলে ১০ বললেও কম বলা হয়। কিন্তু সফো, তায় আবার প্রোজেক্ট ম্যানেজার। মরে গেলেও নিজের ভুল স্বীকার করব না। তাই ঝটপট লিখলাম – “Damn that autocorrect, I wanted to type RIP.”

তবে এ পর্যন্ত পড়ে যদি এটাই ভেবে থাকেন autocorrect-এর ভূমিকা আমার জীবনে শুধু দায় ঝেড়ে ফেলার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ, তাহলে ভুল করছেন। কয়েক বছর আগে Autocorrect-এর তুতো ভাই ছিল T9 ডিকশেনারি, মনে আছে নিশ্চয়? ভুল করেও অন করা থাকলে মেসেজ লেখার ক্ষেত্রে তার পাকামিতে প্রাণ জেরবার হয়ে যেত। আমি তখন আমার ঐ ছানার জায়গায়, আমার গডমাদার ছিল জিগীষা।
তা একদিন জিগীষা আমায় মেসেজ পাঠাল তার ছেলে চিরাগের শরীর খারাপ, সে হাসপাতাল যাচ্ছে, আমি যেন অনসাইট টিমের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সেদিনের কাজ শেষ করে নিই। আমি সঙ্গে সঙ্গে টাইপ করলাম – “You take Chirag to hospital, I will contact onsite team.” T9 ডিকশেনারি বোধ হয় জাহাঙ্গীরের আমলে বানানো হয়েছিল। টমাস রো এই অভিধান ব্যবহার করেই ইংল্যান্ডে এস এম এস পাঠাতেন। তাই স্বভাবতই তাতে onsite শব্দটা নেই। সে মূর্খ মোবাইলের ঐ কি-গুলো অবলম্বন করে কাছাকাছি যেটা খুঁজে পেল, সেটা হল morgue – তুমি চিরাগকে নিয়ে হাসপাতালে যাও, আমি মর্গে যোগাযোগ করছি। ভাগ্য ভালো, পাঠানোর আগে মেসেজটা আরেকবার পড়ে দেখেছিলাম।

যাকগে, এই গল্প দুটো এর আগে কোথাও না কোথাও বলেইছি। তা এইসব ভুল ইংরাজি, সম্ভাব্য ইংরাজির সঙ্গেই সম্পর্কিত আরেকটা গল্প কোথাও বলিনি এখনও, সেটা শোনাই।
আমি তখন সবে সফোগিরিতে হাত পাকাচ্ছি। মাইসোরে ট্রেনিং চলছে। দিনের প্রথমভাগে থিওরি পড়ানো হত। লাঞ্চের পর হত হ্যান্ডস্‌ অন বা হাতেকলমে শিক্ষা। পিতৃদত্ত নামের আদ্যাক্ষর অনুসারে ইয়েতি বসত আমার পাশেই। একদিন কী হয়েছিল, কারোরই লাঞ্চের পর বিশেষ ইচ্ছা করছিল না কাজকর্ম করতে। তাই সময় কাটাতে ইয়েতিকে কেউ একটা মেল পাঠাল জাঙ্ক প্রোগ্রামিং করা একটা এক্সিকিউটেবল ফাইল (exe) এ্যাটাচ করে। ইয়েতি মেল থেকে এক্সিকিউটেবল ফাইলটা ডাউনলোড করে ঘ্যাঁচাঘ্যাঁচ ডাবল ক্লিক করে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই হাজারো পপ-আপে ছেয়ে গেল তার স্ক্রিন। প্রতিটা পপ-আপেই বিকিনি পরা (বা না-পরা) ললনাদের ছবি। যে কোনও ভাষা নতুন শিখলে, জনগণ সাধারণত গালাগালগুলোই আগে শেখে। তা প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের ক্ষেত্রেও বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? কাজের থেকে অকাজগুলোই লোকজন ঝটসে শিখে ফেলেছে। যে ছোটলোক মেলটা পাঠিয়েছিল, সে পেছনে বসে মজা দেখছিল। সে এবার ইয়েতির স্ক্রিনের দিকে আঙুল তুলে হ্যা হ্যা করে হাসতে আরম্ভ করল। আরও কেউ কেউ এর আগে ঐ ফাইলটা খুলতে গিয়ে বোকা বনেছিল। তারাও ইয়েতিকে বেকায়দায় দেখে হৈ হৈ করে উঠল। মোটকথা, ল্যাব সেশানের মধ্যে হৈ-হৈ কাণ্ড, রৈ রৈ ব্যাপার। ইন্সট্রাক্টার হিসাবে ছিলেন রীনা নামের এক শান্তশিষ্ট ভদ্রমহিলা। তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামলেন। মিনিট দশেকের চেষ্টায় সবাই আবার নিজের মনিটরের দিকে চোখ ফেরাল। এসবের মধ্যেই ইয়েতির অন্য পাশে যে মেয়েটি বসত, সে মিচকি হেসে ইয়েতিকে লক্ষ করে আলপটকা মন্তব্য করে বসল – “মুঝে নেহি পতা থা, তুম এ্যায়সে হো।” এমনিতেই পপ-আপ বোম্বের হাত থেকে বাঁচতে কম্পিউটার রিস্টার্ট করতে হয়েছে। তার ফলে ইয়েতির গত এক ঘণ্টায় করা আধ লাইনের একটা প্রোগ্রাম উড়েও গেছে। তারপর এমন চুমকি চৌধুরীর মতো ডায়লগ। ইয়েতি খোঁচাটা হজম করে নির্লিপ্ত মুখে চুপচাপ ঐ মেলটি ফরওয়ার্ড করে দিল মেয়েটির মেল আইডি-তে। মেয়েটি ইয়েতির স্ক্রিনের ছবিই দেখেছিল কেবল, উৎসটা জানত না। তাই সে সরল বিশ্বাসে ফাইলটা খুলল। এবার এক মেয়ের স্ক্রিনে পটাপট খুলে যাচ্ছে কয়েক হাজার বিকিনি পরিহিতা (বা না-পরিহিতা) মেয়েদের পপ-আপ। ল্যাবে শোরগোলের মাত্রা হয়ে গেল আগের থেকেও কয়েক গুণ বেশি।
রীনা হাল ছেড়ে দিয়ে সব দেখেশুনে ডিসিপ্লিন ভাঙার দায়ে ইয়েতিকে এবং তার পাশের মেয়েটিকে পাঠিয়ে দিলেন ট্রেনিং প্রোগ্রামের সুপার বস বন্দনার কাছে। ইয়েতি যাওয়ার সময় আমায় বগলদাবা করে নিয়ে গেল – “তুই সাক্ষী থাকবি।” খুব সত্যি বলতে কী, শুঁড়ির সাক্ষী হওয়ার মতো মাতাল আমি নই। কিন্তু কলেজ থেকে আজ অব্দি ইয়েতির একমাত্র সাক্ষী আমিই। তাছাড়া শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, তা দেখার লোভ সামলাতেও পারছিলাম না। সঙ্গে গেলাম।
বন্দনার কেবিনে ঢুকেই ইয়েতি আমার দিকে আঙুল দেখাল – “He… he knows everything.” বন্দনা বেশ সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি ঢোঁক গিলে বললাম – “Witness.” বন্দনা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে আমার দিকে হাত নেড়ে ইয়েতিকে প্রশ্ন করলেন – “তুমিই বলো কী হয়েছিল।”
ইয়েতি এতটা আশা করেনি। যে কোনও অভিযোগে কলেজে সে বেচারা বলার সুযোগই পেত না এতদিন। পেলেও শাস্তিঘোষণার পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” পর্যন্তই। তাই এখানে আগে বলতে পেয়ে চকচকে মুখে হড়বড়িয়ে শুরু করল সে – “Reena was giving us hand job today and…” আমাদের সঙ্গে যে মেয়েটি ছিল সে বেচারা হাসি চাপতে চাপতে “Excuse me” বলে ঘরের বাইরে দৌড়াল। আমার অবস্থা বিরিঞ্চিবাবার সত্যব্রতের মতো, কল্পনা করছি ইয়েতির বন্ধু হওয়ার কারণে আমায় চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আমি মাইসোর ক্যাম্পাসের বাইরে খালি গায়ে বাটি নিয়ে বসে। ওদিকে বন্দনা তাঁর কেরিয়ারের সবথেকে আশ্চর্য ঘটনার মুখোমুখি হয়ে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে – “Reena was giving you what?” হাসি না চাপতে পারার রোগ তো আমার চিরদিনের। তাই সত্যব্রতেও কাজ হল না। খ্যাকখ্যাক করে হাসতে হাসতে বললাম – “Hands-on… was giving hands-on…”
তারপর যতদিন মাইসোরে ছিলাম, ইয়েতির ওপর দিয়ে কী গিয়েছিল, তা গোপন থাকাই ভালো। এখনও ঘটনাটা প্রসঙ্গক্রমে উঠলে ইয়েতি ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে – “কোন শালা খাঁটি বিলিতি ইংরাজি বলে বল? কিন্তু তারপরে বন্দনা আমায় একশ কুড়ি ঘণ্টার কর্পোরেট কমিউনিকেশান ক্লাসে জোর করে পাঠিয়ে কাজটা ঠিক করেনি। যাই বলিস, যদ্দিন বেঁচে থাকব, ওকে আমি ক্ষমা করব না।”
ইংরাজি কেউই বোধ হয় বিশুদ্ধ বলেন না, আমি তো তো নই-ই। কিন্তু যে জন্যে প্রায় হাজারটা শব্দ খরচ করে পোস্টটা লিখলাম, সেটা এবার খোলসা করি। আজ ফেসবুকে দেখলাম বন্দনার জন্মদিন। জন্মদিনে মানুষ শত্তুরকেও ক্ষমা করে দেয়। একটা উইশ করেই দে ইয়েতি। ভদ্রমহিলা খুশি হবেন। তোর মতো পুণ্যাত্মাকে শাস্তি দিয়ে সে মানুষটাও কি এতদিন শান্তিতে আছে রে?

14
2 Comments
  • Mriganka
    June 30, 2016

    khyaak khyak khyaak .. ho ho ha ha hya hyaa hyaa ityaadi 😀 😀

    এটা যাতা একেবারে যাতা …মানে ইয়ে হ্যা হ্যা হ্যাআ হ্যা হ্যা খ্যাঁক খ্যাক খ্যাক

    • rohonkuddus@gmail.com
      June 30, 2016

      ইয়েতি আর লামা থাকলেই যাতা ব্যাপারই ঘটতে থাকে বটে। 😀

Leave a Reply to Mriganka Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *